সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-৪)
একসময় সাংবাদিকতা বলতে মূলত সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের কথা বোঝানো হতো। এখন সেই সময় বদলে গেছে। এখন নিজের হাতে থাকা একটি স্মার্টফোন দিয়েই কেউ ঘটনা ধারণ করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করতে পারেন। ব্লগে নিজের লেখা প্রকাশ করতে পারেন। কোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তথ্য দিতে পারেন। নিয়মিতভাবে জনস্বার্থের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশও করতে পারেন।
ফলে সাংবাদিকতা এখন শুধু একটি সংবাদকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও সাংবাদিকতার ধারণা আগের চেয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি সাংবাদিকতাকে এমন একটি কাজ হিসেবে দেখেছে, যা শুধু পূর্ণকালীন পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্লগার ও নিজস্ব মাধ্যমে প্রকাশ করেন—এমন ব্যক্তিরাও সাংবাদিকতার কিছু কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন। UNESCO-ও সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের তার সাংবাদিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের পরিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ, সাংবাদিকতা শুধু পরিচয়পত্র বা প্রতিষ্ঠানের নামের ওপর নির্ভর করে না। কাজটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কে সাংবাদিক?
এই প্রশ্নের সহজ কোনো এক লাইনের উত্তর নেই। কেউ একটি সংবাদমাধ্যমে চাকরি করেন। তিনি সাংবাদিক হতে পারেন। কেউ স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করেন এবং নিয়মিত জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ করেন। তিনিও সাংবাদিকতার কাজ করতে পারেন। কেউ ব্লগে অনুসন্ধানী লেখা প্রকাশ করেন। তার কাজও সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য বহন করতে পারে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঘটনার প্রত্যক্ষ তথ্য, ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করেন। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী বা তথ্যদাতা হতে পারেন। কিন্তু শুধু একটি পোস্ট করলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবাদিক বলা যাবে—এমন নয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজের ধরন, উদ্দেশ্য, ধারাবাহিকতা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের ভূমিকা।
শুধু পোস্ট করলেই সাংবাদিকতা হয় না
ডিজিটাল যুগে যে কেউ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু প্রকাশ করতে পারা আর সাংবাদিকতা করা এক বিষয় নয়।
একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে কোনো দাবি করা হলো।
সাংবাদিকতার প্রথম প্রশ্ন হবে— তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে? কেউ কি তা যাচাই করেছে? অন্য পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি? ছবি বা ভিডিওটি সত্যিই ওই ঘটনার কি না? তথ্যটি পুরোনো কি না? কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়েছে কি না? অভিযোগকে কি সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে বা না উপস্থাপন করে শুধু দ্রুত প্রকাশ করা সাংবাদিকতা নয়।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: গতি
ডিজিটাল সংবাদ পরিবেশে দ্রুত প্রকাশের প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। কে আগে প্রকাশ করবে? কে বেশি ভিউ পাবে? কে বেশি শেয়ার পাবে? কে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে? এই প্রতিযোগিতার মধ্যে কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হারিয়ে যায়—
তথ্যটি সত্য কি না।
একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। পরে সেটি ভুল প্রমাণিত হলেও আগের পোস্টের স্ক্রিনশট, ভিডিও বা শিরোনাম ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই ডিজিটাল সাংবাদিকতায় দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা ও যাচাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন এক নয়
এই দুটি শব্দ প্রায়ই একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে।
মিসইনফরমেশন (Misinformation) হলো ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা কেউ ভুলবশত ছড়িয়ে দিতে পারেন। তথ্যটি মিথ্যা হতে পারে, কিন্তু ছড়ানোর সময় ব্যক্তির উদ্দেশ্য মিথ্যা প্রচার করা নাও হতে পারে। আর ডিজইনফরমেশন (Disinformation) হলো মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা জেনে-শুনে বা পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়। দুটির ফলই ক্ষতিকর হতে পারে। তবে উদ্দেশ্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সাংবাদিক যাচাই না করে ভুল তথ্য প্রকাশ করলেন। এটি গুরুতর পেশাগত ব্যর্থতা হতে পারে।
আবার কেউ তথ্যটি মিথ্যা জেনেও মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার জন্য প্রকাশ করলেন। এটি আরও গুরুতর সমস্যা।
তাই ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো—দুটিকে একইভাবে দেখা উচিত নয়।
মিসইনফরমেশন ছড়িয়ে সাংবাদিকতা হবে না
সাংবাদিকের হাতে তথ্য প্রকাশের শক্তি আছে। এই শক্তির সঙ্গে দায়িত্বও আছে।
কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দাবি করেছেন—এটি নিজে কোনো প্রমাণ নয়। কোনো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে—এটিও সত্যতার প্রমাণ নয়। আবার কোনো ছবি হাজার মানুষ শেয়ার করেছে—এটিও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ নয়। বরং ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। একজন সাংবাদিকের কাজ হওয়া উচিত— ভাইরাল তথ্যকে সংবাদ বানানো নয়; যাচাই করে তথ্যকে সংবাদে পরিণত করা।
ডিজইনফরমেশন সাংবাদিকতার নামে চলতে পারে না
ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি বা ছড়িয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারও রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। কোনো সাংবাদিক কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা করতে পারেন। কোনো নীতির বিরোধিতা করতে পারেন। কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করতে পারেন। এসব নিজের সাংবাদিকতার সমস্যা নয়।
সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন তথ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়। যখন নিজের জানা মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়। যখন প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যখন ছবি, ভিডিও বা বক্তব্যের অংশবিশেষ ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়।
তাই, সমালোচনা সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে। তবে, মিথ্যা তৈরি করা সাংবাদিকতার অংশ নয়।
নাগরিক সাংবাদিকতা: অধিকার আছে, দায়িত্বও আছে
ডিজিটাল যুগে সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছেন। কোনো দুর্ঘটনা, হামলা, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা জনসমাবেশের প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনাটি প্রথম ধারণ করতে পারেন। তার ছবি বা ভিডিও সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক তথ্য হতে পারে। এটি সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশকে আরও উন্মুক্ত করেছে।
কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য— তথ্যটি সত্য কি না? স্থান ও সময় নিশ্চিত কি না? ভিডিওটি সম্পূর্ণ কি না? কাউকে অযথা শনাক্ত করা হচ্ছে কি না? ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? অর্থাৎ, সাংবাদিকের পরিচয় থাকুক বা না থাকুক, তথ্য প্রকাশের সঙ্গে দায়িত্ব জড়িত এটা ভুলে গেলে আমাদের চলবে না।
সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাতা কি সাংবাদিক?
সব কনটেন্ট নির্মাতা সাংবাদিক নন। একজন মানুষ নিয়মিত বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরি করতে পারেন। কেউ ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কেউ পণ্য প্রচার করতে পারেন। এসব সাংবাদিকতা নয়।
আবার কেউ নিয়মিতভাবে জনস্বার্থের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করতে পারেন। তার কাজ সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য বহন করতে পারে। তাই শুধু প্ল্যাটফর্ম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তাই, কোন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা হচ্ছে? তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ- কীভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করা হচ্ছে—তা।
স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সীমাহীন দায়িত্বহীনতা নয়
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু কোনো অধিকারই অন্যের অধিকার সম্পূর্ণ ধ্বংস করার লাইসেন্স নয়। ভুল তথ্যের কারণে কারও সম্মান নষ্ট হতে পারে। মিথ্যা অভিযোগের কারণে কেউ সামাজিকভাবে হেয় হতে পারেন। ভুল পরিচয়ের কারণে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হতে পারেন। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের কারণে কারও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একটি মিথ্যা খবরের কারণে একটি পরিবার ভয় ও সামাজিক চাপের মধ্যে পড়তে পারে। ডিজিটাল যুগে এই ক্ষতি আরও দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তাই মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে হলে তথ্য প্রকাশের দায়িত্বও রক্ষা করতে হবে।
সাংবাদিকের কিছু মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত
কোনো তথ্য প্রকাশের আগে একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক নিজেকে অন্তত কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন— আমি কি তথ্যটি যাচাই করেছি? আমার কাছে কি যথেষ্ট প্রমাণ আছে? আমি কি অভিযোগ ও নিশ্চিত তথ্য আলাদা করেছি? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেছি কি? ছবি বা ভিডিওটির উৎস ও সময় নিশ্চিত কি? এই তথ্য প্রকাশের জনস্বার্থ কী? আমার প্রতিবেদনের কারণে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি তৈরি হবে কি? ভুল হলে আমি কি তা প্রকাশ্যে সংশোধন করব?
এই প্রশ্নগুলো সাংবাদিকতাকে দুর্বল করে না। বরং সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
সাংবাদিকতা শুধু স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়
সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। সাংবাদিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা জরুরি। আবার তথ্যের উৎসের নিরাপত্তা রক্ষা করাও জরুরি। সাংবাদিককে ভয় দেখানো, হামলা করা, হয়রানি করা বা অন্যায়ভাবে আটক করা গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে সাংবাদিকতা যেন মানুষের আস্থা হারিয়ে না ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার প্রকাশের ক্ষমতা নয়। তার বিশ্বাসযোগ্যতা। বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে স্বাধীন সাংবাদিকতার সামাজিক শক্তিও দুর্বল হয়ে যায়।
মূল্যায়ন
FoEBD মনে করে, ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা বিস্তৃত হলেও সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব কমে যায়নি। বরং দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
যে ব্যক্তি সাংবাদিকতার কাজ করেন, তিনি পেশাদার সাংবাদিক, স্বাধীন সাংবাদিক, ব্লগার, অনলাইন লেখক, নাগরিক সাংবাদিক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা—যাই হোন না কেন, তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে যাচাই ও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই, মিসইনফরমেশন ছড়িয়ে সাংবাদিকতা করা যায় না। ডিজইনফরমেশনকে সাংবাদিকতা বলা যায় না। মতামতকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা যায় না।
আবার একই সঙ্গে এসব নীতির কথা বলে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা বন্ধ করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।
আপনার মূল প্রশ্ন হবে— তথ্যটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে? কীভাবে যাচাই করা হয়েছে? কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে? এবং প্রকাশের পেছনে প্রমাণ কী? কারণ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার জবাবদিহি—দুটিই ওতোপ্রতোভাবে জড়িতএবং প্রয়োজন।
কেননা, স্বাধীন সাংবাদিকতা মানুষের জানার অধিকার রক্ষা করে।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানুষের সত্য জানার অধিকার রক্ষা করে।
তথ্যসূত্র
- UN Human Rights Committee — General Comment No. 34
- UNESCO — Director-General’s Report / Methodology
- UNESCO — How can journalism reinvent itself?
- UNESCO — Is journalism old news?
- Council of Europe — Recommendation CM/Rec(2016)4
- Council of Europe — Implementation of CM/Rec(2016)4
- UNESCO — Building digital safety for journalism





