সত্যেন সেন ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক সংগ্রাম—দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।
সত্যেন সেনের সাহিত্যজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরা। তাঁর বহু ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে ‘আলবেরুনী’ অন্যতম।
জেলের ভেতরে লেখা ‘আলবেরুনী’
‘আলবেরুনী’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র একাদশ শতকের মুসলিম জ্ঞানসাধক, গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী আবু রায়হান আলবেরুনী। আলবেরুনীর ভারত-ভ্রমণ, জ্ঞানচর্চা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধিৎসাকে কেন্দ্র করে সত্যেন সেন উপন্যাসটি রচনা করেন। বর্তমান সংস্করণের প্রকাশনা-তথ্যেও বইটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বইটির ভূমিকাসংক্রান্ত বিবরণে বলা হয়েছে, সত্যেন সেন কারাগারে বসেই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। কারাগারে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সুযোগ সীমিত থাকায় কাজটি তাঁর জন্য কঠিন ছিল।
উপন্যাসটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। একই সময় সত্যেন সেন পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার অধীনে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কারাজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রকাশের পর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ
‘আলবেরুনী’ প্রকাশের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বইটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রকাশিত একটি জীবনীমূলক লেখায় সরাসরি বলা হয়েছে, পাকিস্তান সরকার ‘আলবেরুনী’ নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করেছিল।
আরও একটি সাহিত্যবিষয়ক সূত্রে ১৯৬৯–৭০ সালের ওই সময়ের নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত বইগুলোর তালিকায় সত্যেন সেনের ‘আলবেরুনী’-র নাম রয়েছে। একই তালিকায় ছিল আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’, বদরুদ্দীন উমরের কয়েকটি বই এবং ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর ‘জেলে তিরিশ বছর’।
সমসাময়িক Pakistan Observer-এর ১৪ জানুয়ারি ১৯৭০-এর প্রতিবেদনের উল্লেখও পরবর্তী সূত্রে পাওয়া যায়। সেখানে ওই সময়ের বই নিষেধাজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল?
এখানেই তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ‘আলবেরুনী’ নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত হওয়ার সরকারি আদেশ, গেজেট কিংবা নির্দিষ্ট আইনি ধারা আমরা প্রকাশ্য অনলাইন সূত্রে শনাক্ত করতে পারিনি। ফলে বইটি ঠিক কোন অভিযোগে বা কোন আইনের অধীনে নিষিদ্ধ হয়েছিল—এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তবে বহু বছর পর প্রকাশিত একটি ইংরেজি গবেষণামূলক নথিতে বইটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে কিছু অনুমান করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, উপন্যাসে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চার প্রতি আলবেরুনীর শ্রদ্ধা, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৈন্যশাসন সম্পর্কে একটি সমালোচনামূলক বক্তব্য তৎকালীন কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্যাজনক মনে হয়ে থাকতে পারে। তবে ওই নথিটিও এগুলোকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সরকারি কারণ হিসেবে নয়।
একটি ঐতিহাসিক চরিত্র, সমকালীন প্রশ্ন
‘আলবেরুনী’কে শুধুমাত্র একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনের কাহিনি হিসেবে দেখলে বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। সত্যেন সেন আলবেরুনীর জ্ঞানচর্চা, অনুসন্ধিৎসা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহকে সামনে এনেছিলেন। বর্তমান সময়ের একটি বিশ্লেষণেও বইটিতে মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সাহিত্যিক স্বাধীনতার পাশাপাশি ইতিহাস, জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
তবে এখানে FoEBD-এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বইটি কী বলতে চেয়েছিল সে বিষয়ে মূল্যায়নের চেয়ে, বইটি প্রকাশের পর রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছিল তার দলিল সংরক্ষণ করা।
নিষেধাজ্ঞার পরও বইটির টিকে থাকা
‘আলবেরুনী’ পরবর্তী সময়ে আবার প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনা ও বই বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে বইটির নতুন সংস্করণ পাওয়া যায়। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সংস্করণের প্রকাশনা-তথ্যও অনলাইনে রয়েছে। অর্থাৎ, ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া একটি বই পরবর্তী সময়ে পুনঃপ্রকাশিত হয়ে বাংলা পাঠকের কাছে ফিরে এসেছে।
‘আলবেরুনী’ পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক প্রকাশনার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ। উপলব্ধ সূত্রে বইটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে নিষেধাজ্ঞার মূল সরকারি আদেশ এবং নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি নথি যাচাই করা যায়নি।
তাই ‘আলবেরুনী’ কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে, বইটি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে—এই যাচাইযোগ্য ইতিহাসটিই এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ঘটনাটি একই সঙ্গে দেখায় যে, একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসও কখনো কখনো তার সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে যেতে পারে যে সেটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী — সত্যেন সেনের জীবনী ও ‘আলবেরুনী’ নিষিদ্ধ-বাজেয়াপ্তির তথ্য
২. বিডিনিউজ২৪ ডটকম — আবদুল মান্নান সৈয়দ ও ১৯৬৯–৭০ সালের বই নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ
৩. যুগান্তর — যে বইগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছিল
৪. প্রথম আলো — সত্যেন সেন ও ‘আলবেরুনী’
৫. বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী — সত্যেন সেনের জীবনী
৬. রকমারি — ‘আলবেরুনী’, সত্যেন সেন
৭. বইয়ের প্রকাশনা-তথ্য — ‘আলবেরুনী’
৮. ERIC — Satyen Sen’s Alberuni ও তৎকালীন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গবেষণামূলক নথি





