সাংবাদিকের অধিকার জানুন (পর্ব-১)
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা। কেউ জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করেন। কেউ স্থানীয় পত্রিকায়। কেউ অনলাইন গণমাধ্যমে। আবার কেউ ফ্রিল্যান্স হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন, ছবি বা ভিডিও সরবরাহ করেন।
তাদের কাজের ধরন আলাদা হতে পারে। কিন্তু জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অনেকেরই রয়েছে।
বাস্তবে অনেক সাংবাদিক নিয়মিত বেতন বা সম্মানী পান না। কেউ মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন। কেউ নিজের মোটরসাইকেলের জ্বালানি, মোবাইল, ইন্টারনেট ও সংবাদ সংগ্রহের অন্যান্য খরচ নিজেই বহন করেন। অনেক জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধির লিখিত নিয়োগপত্রও থাকে না।
ন্যায্য পারিশ্রমিকের প্রশ্নটি তাই শুধু টাকার বিষয় নয়। এর সঙ্গে পেশার মর্যাদা, কাজের স্বাধীনতা এবং মানসম্মত সাংবাদিকতার প্রশ্নও জড়িত।
কেন ন্যায্য বেতন গুরুত্বপূর্ণ?
একজন সাংবাদিক সারাদিন মাঠে কাজ করেন। তথ্য সংগ্রহ করেন। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নেন। তথ্য যাচাই করেন। অনেক সময় ঝুঁকিও নেন। কিন্তু তাঁর যদি ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে স্বাধীন ও মানসম্মত সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ন্যায্য ও নিয়মিত পারিশ্রমিক—
- সাংবাদিকতাকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়ায়;
- ব্যক্তিগত আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করে;
- জনস্বার্থভিত্তিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে;
- দক্ষ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের পেশায় ধরে রাখতে সাহায্য করে;
- সংবাদকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
তবে শুধু বেতন বাড়ালেই ভালো সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয় না। সাংবাদিকতার মান নির্ভর করে তথ্য যাচাই, নৈতিকতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ওপরও।
ওয়েজ বোর্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের শ্রম আইনে সংবাদপত্র শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য পৃথক সংবাদপত্র শ্রমিক মজুরী বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৪৩ ধারায় সংবাদপত্র শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য এই বোর্ড গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ১৪৪ ধারায় মজুরি নির্ধারণের সময় জীবনযাত্রার ব্যয়, সমতুল্য চাকরির প্রচলিত মজুরি এবং সংবাদপত্র শিল্পের অবস্থা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত সরকার গেজেটে প্রকাশ করতে পারে এবং আইনে অন্তর্বর্তী মজুরি নির্ধারণেরও বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ ওয়েজ বোর্ড শুধু সাংবাদিকদের বেতন নিয়ে একটি দাবি নয়। সংবাদপত্র শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি ও চাকরির কিছু শর্ত নির্ধারণের জন্য এটি একটি আইনগত কাঠামো।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
ওয়েজ বোর্ডের বিষয়টি এখনও সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদপত্র কর্মচারী ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব নিউজপেপার প্রেস ওয়ার্কার্স, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (BFUJ) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (DUJ) দশম ওয়েজ বোর্ড দ্রুত গঠন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন মহার্ঘ ভাতা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখনও ২০১৯ সালে ঘোষিত নবম ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি।
এসব তথ্য দেখায় যে সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক ও চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জেলা ও উপজেলা সাংবাদিকদের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবাদপ্রবাহে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ের অনেক সাংবাদিক—
- নিয়মিত বেতন বা সম্মানী পান না;
- লিখিত নিয়োগপত্রের বাইরে কাজ করেন;
- সংবাদ সংগ্রহের যাতায়াত খরচ নিজেই বহন করেন;
- মোবাইল ও ইন্টারনেটের খরচ বহন করেন;
- ক্যামেরা বা অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ নিজেই বহন করেন;
- হামলা, দুর্ঘটনা বা অন্য ঝুঁকির সময় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নাও পেতে পারেন।
তবে সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একইভাবে পরিচালিত হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পারিশ্রমিক, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই বিষয়টি প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা হতে পারে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাজের শর্ত ও পারিশ্রমিকের বৈষম্য নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের কথাও ভাবতে হবে
বর্তমানে অনেক সাংবাদিক কোনো একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কাজ করেন না। তারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন, ছবি বা ভিডিও সরবরাহ করে থাকেন। তাদের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও ন্যায্য কর্মসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজন হতে পারে—
- কাজের ধরন ও পারিশ্রমিকের বিষয়ে স্পষ্ট চুক্তি;
- নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ;
- কাজের স্বীকৃতি;
- সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা;
- কাজের জন্য ব্যবহার করা উপকরণ ও ব্যয়ের বিষয়ে স্বচ্ছতা।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতিতে একই ধরনের চাকরির অধিকার প্রযোজ্য হবে—এমনটি বলা যায় না। তবে কাজের শর্ত ও পারিশ্রমিক স্পষ্ট থাকা উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায্য পারিশ্রমিকের সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সম্পর্ক
আর্থিক অনিরাপত্তা সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একজন সাংবাদিক যদি নিয়মিত পারিশ্রমিক না পান এবং নিজের সব কাজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পেশায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি সাংবাদিকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখানেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায্য পারিশ্রমিক সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু স্বাধীন সাংবাদিকতা মানেই দায়মুক্তি নয়। সাংবাদিকের যেমন অধিকার আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে। তথ্য যাচাই করা, ভুল হলে সংশোধন করা, অভিযোগকে সত্য হিসেবে না লেখা এবং জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্বের অংশ।
সাংবাদিকের নিজের করণীয়
নিজের পেশাগত অধিকার সম্পর্কে সাংবাদিকেরও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সম্ভব হলে—
- লিখিত নিয়োগপত্র বা চুক্তি নিন;
- বেতন, সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার থাকুন;
- সংবাদ সংগ্রহে নিজের খরচ ও কাজের হিসাব সংরক্ষণ করুন;
- বেতন বা সম্মানী সংক্রান্ত নথি রাখুন;
- কর্মস্থলের নীতিমালা সম্পর্কে জানুন;
- পেশাগত অধিকার ও শ্রম আইনের প্রাসঙ্গিক বিধান সম্পর্কে ধারণা রাখুন;
- একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নৈতিক মান বজায় রাখুন।
FOEBD-এর দৃষ্টিতে
FOEBD মনে করে, সাংবাদিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়। এটি স্বাধীন, পেশাদার ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। তবে সাংবাদিকের অধিকার এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব—দুটিকে পাশাপাশি দেখতে হবে। একদিকে সাংবাদিককে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ দিতে হবে। অন্যদিকে সাংবাদিককেও তথ্যের সত্যতা যাচাই, পেশাগত নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
ন্যায্য পারিশ্রমিক কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি পেশাগত মর্যাদা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে ভালো সাংবাদিকতার ভিত্তি শুধু পারিশ্রমিক নয়—স্বাধীনতা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং জবাবদিহিও।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ — সংবাদপত্র শ্রমিকদের মজুরী বোর্ড
বাংলাদেশ শ্রম আইনে সংবাদপত্র শ্রমিকদের জন্য মজুরী বোর্ড গঠন এবং মজুরী নির্ধারণের বিধান রয়েছে। আইনে জীবনযাত্রার ব্যয়, সমতুল্য চাকরির মজুরী ও সংবাদপত্র শিল্পের অবস্থা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ — ধারা ১৪৩–১৪৪
২. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪
আইনে সংবাদপত্রের মান উন্নয়ন এবং কর্মরত সাংবাদিকের সংজ্ঞা সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এতে সম্পাদক, রিপোর্টার, সংবাদদাতা, ফিচার লেখক, সংবাদচিত্রগ্রাহকসহ বিভিন্ন ধরনের সংবাদকর্মীকে কর্মরত সাংবাদিকের সংজ্ঞার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। The Press Council Act, 1974 — বাংলাদেশ আইন
৩. বাংলাদেশ সংবাদপত্র কর্মচারী ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব নিউজপেপার প্রেস ওয়ার্কার্স — দশম ওয়েজ বোর্ডের দাবি
২০২৬ সালের এপ্রিলে সংবাদপত্র কর্মচারী ও প্রেসকর্মীদের পক্ষ থেকে নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের দাবি জানানো হয়। BSS: Media employees demand immediate formation of 10th wage board





