অধ্যায় ১
টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক বেতন কাঠামো: একটি পুরোনো দাবির নতুন উচ্চারণ
বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ, বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর সংবাদপত্র শিল্পে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের জন্য একাধিক ওয়েজ বোর্ড গঠিত হলেও, সম্প্রচারমাধ্যম—বিশেষ করে টেলিভিশন সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ, দায়িত্ব ও পেশাগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পৃথক বেতন কাঠামো বা নীতিমালার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ও চিফ রিপোর্টাররা টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো (টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড) প্রণয়নের দাবি পুনরায় উত্থাপন করলে বিষয়টি আবারও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে।
এই দাবি কেবল বেতন বৃদ্ধির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেশাগত স্বীকৃতি, কাজের ধরন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কর্মঘণ্টা, ঝুঁকি, চাকরির নিরাপত্তা এবং সম্প্রচার সাংবাদিকতার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের প্রশ্ন। অন্যদিকে, একটি মত হলো—পৃথক ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে বিদ্যমান সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডকে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করাই অধিক বাস্তবসম্মত। ফলে এটি শুধু শ্রম অধিকার নয়; বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্ক।
২০২৬ সালের ২৫ জুলাই ডিআরইউর আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মীরা টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো, সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা, প্রবেশ পর্যায়ের ন্যূনতম বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সাপ্তাহিক দুই দিনের ছুটি, অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণের দাবি জানান।
বিশেষভাবে ডিবিসি নিউজের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর আদিত্য আরাফাত এবং এটিএন নিউজের চিফ রিপোর্টার আরিফ হোসেন টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজ বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, সম্প্রচার সাংবাদিকদের দায়িত্ব, কর্মঘণ্টা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাজের ধরন প্রচলিত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডিআরইউর সাম্প্রতিক সভার প্রেক্ষাপট
ডিআরইউ দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, কর্মপরিবেশ ও কল্যাণসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এই সভায় সভাপতি আবু সালেহ আকন সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু, ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধ এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল জানান, ঈদের ছুটি পাঁচ দিনে উন্নীত করার পর এখন সংগঠনটি সাপ্তাহিক দুই দিনের ছুটি এবং প্রবেশ পর্যায়ে ন্যূনতম ৩৫ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণের দাবিতে কাজ করছে।
সভায় আরও গুরুত্ব পায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo), ডিজিটাল দক্ষতা, সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল এবং পেশাগত নৈতিকতা। এতে স্পষ্ট হয় যে, পৃথক বেতন কাঠামোর প্রশ্নটি সাংবাদিকতার সামগ্রিক সংস্কার আলোচনার একটি অংশ।
বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন গণমাধ্যম দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে একজন টেলিভিশন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি লাইভ রিপোর্টিং, ভিডিও ধারণ, মোবাইল সাংবাদিকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ উপস্থাপনার মতো বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
অন্যদিকে, বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ডগুলোর কাঠামো মূলত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক। ফলে সম্প্রচার ও ডিজিটাল সাংবাদিকতায় সৃষ্টি হওয়া অনেক নতুন পদ, দক্ষতা ও দায়িত্ব সেই কাঠামোয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তবে বাস্তবতা হলো, সব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সমান নয়। বিজ্ঞাপন বাজারের পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
একই সময়ে মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম, অনলাইন সাংবাদিকতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের ফলে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার প্রচলিত বিভাজনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের জন্য কি পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড অধিক উপযোগী, নাকি সব ধরনের গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিসংবেদী বেতন কাঠামো অধিক কার্যকর হবে?
এই গবেষণা প্রতিবেদনে ইতিহাস, আইন, সরকারি নীতি, অংশীজনদের অবস্থান, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং শ্রম অধিকারবিষয়ক মানদণ্ডের আলোকে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।
অধ্যায় ২
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ডের ইতিহাস: সংবাদপত্রকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বহুমাধ্যমের যুগে
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বেতন, ভাতা ও চাকরির শর্ত নির্ধারণের ইতিহাস মূলত সংবাদপত্র শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আজ টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বাস্তবতা বোঝার জন্য এই ইতিহাস জানা জরুরি। কারণ বর্তমানে পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ডের দাবির অন্যতম ভিত্তি হলো—বিদ্যমান কাঠামো এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন দেশের প্রধান গণমাধ্যম ছিল সংবাদপত্র।
গত পাঁচ দশকে গণমাধ্যমের প্রকৃতি আমূল বদলে গেছে। সংবাদপত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ডিজিটাল নিউজরুম ও মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo) সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাংবাদিকদের বেতন নির্ধারণের আইনি ভিত্তি এখনও অনেকাংশে সংবাদপত্রকেন্দ্রিক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান ওয়েজ বোর্ড কি এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ওয়েজ বোর্ড কী?
ওয়েজ বোর্ড (Wage Board) হলো সরকার গঠিত একটি সুপারিশকারী সংস্থা, যা সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ন্যূনতম বেতন, ভাতা, পদমর্যাদা ও চাকরির শর্ত নির্ধারণে সুপারিশ প্রদান করে।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো—
- সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা;
- পেশাগত মর্যাদা ও চাকরির নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা;
- বেতন বৈষম্য কমানো;
- সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা।
অর্থাৎ, ওয়েজ বোর্ড কেবল বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা নয়; এটি গণমাধ্যমের শ্রমনীতি ও পেশাগত সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর ধারণা ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তান আমল থেকেই বিকশিত হয়। সে সময় অনিয়মিত বেতন, লিখিত নিয়োগপত্রের অভাব এবং চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা ও বেতন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেই ধারাবাহিকতাকে অনুসরণ করে নিজস্ব ওয়েজ বোর্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
স্বাধীনতার পর গঠিত বিভিন্ন ওয়েজ বোর্ডের লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণ, পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, ভাতা নির্ধারণ এবং চাকরির শর্ত উন্নয়ন। তবে প্রায় প্রতিটি ওয়েজ বোর্ডের ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা গেছে।
কেন সংবাদপত্রকেন্দ্রিক ছিল?
প্রথম দিকের ওয়েজ বোর্ডগুলো গঠনের সময় দেশে বেসরকারি টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বা ডিজিটাল সাংবাদিকতার অস্তিত্ব ছিল না। ফলে সংবাদপত্রই ছিল প্রধান গণমাধ্যম এবং ওয়েজ বোর্ডের সুপারিশও সম্পাদকীয়, রিপোর্টিং, মুদ্রণ ও প্রশাসনিক কাঠামোকেই কেন্দ্র করে প্রণীত হয়। সে সময়ের বাস্তবতায় এটি যৌক্তিক ছিল।
বহুমাধ্যমের যুগে পরিবর্তন
১৯৯০-এর দশক থেকে বেসরকারি টেলিভিশনের আবির্ভাব এবং পরবর্তীকালে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্র, লাইভ সম্প্রচার, ভিডিও সাংবাদিকতা, অনলাইন প্রকাশনা এবং মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম সাংবাদিকতার কর্মপদ্ধতিকে নতুন মাত্রা দেয়।
বর্তমানে একজন টেলিভিশন সাংবাদিককে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ, ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার, মোবাইল সাংবাদিকতা, ওয়েব সংস্করণের জন্য লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট প্রকাশ—সবকিছুই করতে হয়। একই সঙ্গে নিউজরুমে Assignment Editor, Output Editor, News Producer, Executive Producer, Digital Producer, Video Journalist (VJ), Graphics Producer ও PCR/MCR Controller-এর মতো নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলোর অনেকই প্রচলিত ওয়েজ বোর্ডের কাঠামোয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বর্তমান বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে—
- সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব;
- অনেক প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অভাব;
- ছোট ও মাঝারি গণমাধ্যমের আর্থিক সীমাবদ্ধতা;
- স্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিং কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য;
- সম্প্রচার ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার নতুন পদগুলোর পর্যাপ্ত স্বীকৃতির অভাব।
এই বাস্তবতাই টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক বেতন কাঠামো অথবা আরও আধুনিক, সমন্বিত ও বহুমাধ্যমভিত্তিক ওয়েজ বোর্ডের দাবি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
অধ্যায় ৩
সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডের আইনি ভিত্তি, বিবর্তন ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি
৩.১ সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডের আইনি ভিত্তি (১৯৭৪ সালের আইন থেকে বর্তমান শ্রম আইন পর্যন্ত)
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজ বোর্ড গঠনের আইনি ভিত্তি সৃষ্টি হয় The Newspaper Employees (Conditions of Service) Act, 1974 (Act No. XXX of 1974/Act No. 30 of 1974)-এর মাধ্যমে। এই আইনের ৯ ও ১১ ধারায় সরকার সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার সাংবাদিক এবং অন্যান্য সংবাদকর্মীদের জন্য ওয়েজ বোর্ড গঠন এবং তার সুপারিশ সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কার্যকর করার ক্ষমতা পায়। ১৯৭৭ ও ১৯৮৩ সালের ওয়েজ বোর্ডসহ পরবর্তী বোর্ডগুলো এই আইনের ভিত্তিতেই গঠিত হয়।
১৯৭৪ সালের আইনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—
- সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ন্যূনতম বেতন ও ভাতা নির্ধারণ;
- পদভিত্তিক বেতন কাঠামো প্রণয়ন;
- সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস;
- চাকরির শর্ত ও কল্যাণমূলক সুবিধা নির্ধারণ।
তবে আইনটির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল—এটি মূলত সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাকে কেন্দ্র করে প্রণীত। সে সময় দেশে বেসরকারি টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বা ডিজিটাল নিউজরুমের বিকাশ ঘটেনি। ফলে সম্প্রচারমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য পৃথক কোনো বিধান এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের আইন বাতিল হয়। তবে সংরক্ষণ (saving) বিধানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইনের অধীনে গঠিত ওয়েজ বোর্ড, গেজেট, আদেশ ও অন্যান্য কার্যক্রম নতুন আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ফলে সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি; বরং আইনি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
পরবর্তী সময়েও সরকার নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠন করেছে। তবে বর্তমান আইনি কাঠামো এখনও মূলত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক হওয়ায় ডিজিটাল, অনলাইন ও সম্প্রচারমাধ্যমের সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এই বাস্তবতা থেকেই পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড অথবা সব ধরনের গণমাধ্যমকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক ওয়েজ বোর্ডের দাবি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
৩.২ প্রথম থেকে নবম ওয়েজ বোর্ড: সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন
বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র কর্মচারীদের জন্য ওয়েজ বোর্ড একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নীতিগতভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক বিলম্ব, মালিকপক্ষের আপত্তি এবং আদালতের মামলার কারণে প্রায় প্রতিটি বোর্ডের বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ে।
প্রথম ওয়েজ বোর্ড
- স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গঠিত।
- সাংবাদিকদের জন্য প্রথম বেতন কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
- পরবর্তী ওয়েজ বোর্ডগুলোর ভিত্তি স্থাপন করে।
দ্বিতীয় ওয়েজ বোর্ড (১৯৭৭)
- ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ গেজেট প্রকাশ।
- সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস।
- পদভিত্তিক বেতন কাঠামো ও ভাতা নির্ধারণ।
- বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
তৃতীয় ওয়েজ বোর্ড (১৯৮৩)
- ২৭ অক্টোবর ১৯৮৩ গেজেট প্রকাশ।
- নতুন শ্রেণিবিন্যাস, বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং ফিটমেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন।
চতুর্থ থেকে অষ্টম ওয়েজ বোর্ড
এই সময় ধারাবাহিকভাবে একাধিক ওয়েজ বোর্ড গঠিত হয়। মূল্যস্ফীতি, সংবাদপত্র শিল্পের পরিবর্তন এবং সাংবাদিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন ও ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন নিয়ে মালিকপক্ষ, সাংবাদিক সংগঠন এবং আদালতের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
নবম ওয়েজ বোর্ড (২০১৮)
- গঠন: ২৯ জানুয়ারি ২০১৮
- চেয়ারম্যান: বিচারপতি (অব.) মোহাম্মদ নিজামুল হক
- ১৩ সদস্যের বোর্ড
- গেজেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
- আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৪৩
নবম ওয়েজ বোর্ডে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে আয়কর-সংক্রান্ত বিরোধ এবং একাধিক রিট মামলার কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। ২০২৬ সালে সরকার সংসদে জানায়, মামলাগুলো নিষ্পত্তির পর দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দ্রষ্টব্য: প্রথম থেকে অষ্টম ওয়েজ বোর্ডের কিছু তথ্য (যেমন চেয়ারম্যান, সদস্যসংখ্যা ও গঠনের নির্দিষ্ট তারিখ) সরকারি প্রাথমিক নথিতে সহজলভ্য নয়। ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য সরকারি দলিল পাওয়া গেলে এই অংশ হালনাগাদ করা হবে।
৩.৩ বিভিন্ন ওয়েজ বোর্ডের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েজ বোর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময় ও সরকার পরিবর্তিত হলেও মূল উদ্দেশ্য একই ছিল—সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ন্যায্য বেতন, ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা।
তবে প্রায় সব ওয়েজ বোর্ডই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। গেজেট প্রকাশে বিলম্ব, মালিকপক্ষের আপত্তি, আদালতের মামলা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সুপারিশ কার্যকর হতে কয়েক বছর সময় লেগেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অধিকাংশ ওয়েজ বোর্ড এমন সময়ে প্রণীত হয়েছিল, যখন বাংলাদেশের প্রধান গণমাধ্যম ছিল সংবাদপত্র। ফলে পদবিন্যাস, দায়িত্ব ও বেতন কাঠামোও সংবাদপত্রকেন্দ্রিক ছিল। পরবর্তীকালে বেসরকারি টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল নিউজরুম এবং মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার দ্রুত বিকাশ ঘটলেও ওয়েজ বোর্ডের কাঠামো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সমানভাবে অভিযোজিত হয়নি।
বর্তমানে একজন সাংবাদিককে একই সঙ্গে রিপোর্টিং, ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার, মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo), ডিজিটাল প্রকাশনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরির দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ডে এসব নতুন দক্ষতা ও পদের স্বতন্ত্র প্রতিফলন সীমিত।
নবম ওয়েজ বোর্ডের বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি জটিলতা দেখিয়েছে যে, নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠনই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্যও শক্তিশালী আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।
৩.৪ টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক বেতন কাঠামোর দাবির উৎপত্তি ও বিবর্তন
বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনের সম্প্রসারণ, ২৪ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রচার সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে সংবাদপত্রকেন্দ্রিক ওয়েজ বোর্ড কাঠামো টেলিভিশন সাংবাদিকদের দায়িত্ব, দক্ষতা ও কর্মপরিবেশকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে কি না—সে প্রশ্ন গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড অথবা সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ বেতন কাঠামোর দাবি ধীরে ধীরে সামনে আসে।
তবে এই দাবির সূচনা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি এখনও সীমিত। বিভিন্ন সময়ে টেলিভিশন সাংবাদিক, সম্প্রচারমাধ্যমভিত্তিক সংগঠন এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা বিভিন্ন ফোরামে এ বিষয়ে মত প্রকাশ করেছেন।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অবস্থান
বর্তমানে সাংবাদিক সমাজে দুটি প্রধান মত বিদ্যমান। একটি পক্ষের মতে, টেলিভিশন সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ, শিফটভিত্তিক দায়িত্ব, লাইভ সম্প্রচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাজের কারণে তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রয়োজন।
অন্য পক্ষের মতে, বর্তমান মাল্টিমিডিয়া বাস্তবতায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন, রেডিও ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সব ধরনের সাংবাদিককে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক ও অভিন্ন ওয়েজ বোর্ডই অধিক কার্যকর হবে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) ৩৯ দফা দাবিতেও এই অভিন্ন কাঠামোর পক্ষে মত দেওয়া হয়।
সরকারের অবস্থান
এ পর্যন্ত কোনো সরকার টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজ বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে সরকার জানিয়েছে, নবম ওয়েজ বোর্ড-সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির পর দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কেন নতুন করে আলোচনা?
২০২৫–২০২৬ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে কয়েকটি কারণে—
- নবম ওয়েজ বোর্ড দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি;
- টেলিভিশন সাংবাদিকদের দায়িত্ব বহুমাত্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে;
- ২৫ জুলাই ২০২৬ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ও চিফ রিপোর্টাররা সমন্বিতভাবে পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিক নিবন্ধন, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যূনতম বেতন, সাপ্তাহিক দুই দিনের ছুটি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের দাবিও জানানো হয়।
৩.৫ উপসংহার
বাংলাদেশের সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডের ইতিহাস মূলত সংবাদপত্র শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু গত তিন দশকে গণমাধ্যমের প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিকতার বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশ বিদ্যমান কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। ফলে ভবিষ্যতের ওয়েজ বোর্ড শুধু বেতন পুনর্নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং বহুমাধ্যমভিত্তিক সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রশ্নও।
অধ্যায় ৪
বর্তমান ওয়েজ বোর্ড ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের কর্মবাস্তবতা
৪.১ বর্তমান ওয়েজ বোর্ডে টেলিভিশন সাংবাদিকদের পদের স্বীকৃতি
বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য প্রণীত বর্তমান ওয়েজ বোর্ডের পদভিত্তিক কাঠামো মূলত সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া অনেক আধুনিক পদ পৃথকভাবে স্বীকৃতি পায়নি।
বর্তমান টেলিভিশন নিউজরুমে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, আউটপুট এডিটর, নিউজ প্রডিউসার, এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার, ভিডিও জার্নালিস্ট (VJ), ডিজিটাল প্রডিউসার ও গ্রাফিক্স প্রডিউসারের মতো পদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ওয়েজ বোর্ডে এসব পদের জন্য পৃথক শ্রেণিবিন্যাস বা বেতন কাঠামো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব দায়িত্ব প্রচলিত সাংবাদিক পদের আওতায় বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, PCR (Production Control Room) ও MCR (Master Control Room)-এ কর্মরত ব্যক্তিরা সাধারণত সম্প্রচার প্রযুক্তি বা প্রকৌশল শাখার কর্মী হিসেবে বিবেচিত হন। ফলে তারা সব ক্ষেত্রে সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডের আওতায় পড়েন না।
বর্তমান বাস্তবতায় একজন টেলিভিশন সাংবাদিককে প্রায়ই রিপোর্টিং, ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা, লাইভ সম্প্রচার, মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo) এবং ডিজিটাল প্রকাশনার মতো বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ডে এই পরিবর্তিত দায়িত্বের পূর্ণ প্রতিফলন এখনও সীমিত।
৪.২ টেলিভিশন সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ কেন আলাদা?
বর্তমানে প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন—সব ধরনের গণমাধ্যমই ধীরে ধীরে মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবুও সম্প্রচারমাধ্যমের কিছু বৈশিষ্ট্য অন্য মাধ্যমের তুলনায় আলাদা।
টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার ধারাবাহিক সংবাদচক্র, শিফটভিত্তিক কর্মব্যবস্থা, লাইভ সম্প্রচার, ব্রেকিং নিউজের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনা এবং সম্প্রচার প্রযুক্তিনির্ভর দলগত কার্যপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রতিবেদককে অনেক সময় একই সঙ্গে মাঠে রিপোর্টিং, ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশ করতে হয়।
তবে বর্তমানে অনেক সংবাদপত্র ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমও ভিডিও, লাইভ স্ট্রিমিং ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা পরিচালনা করছে। ফলে বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে পার্থক্য আগের তুলনায় কমলেও সম্প্রচারভিত্তিক নিউজরুমের সাংগঠনিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদা এখনও কিছু ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র।
৪.৩ পৃথক বেতন কাঠামো: পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি
টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
পৃথক বেতন কাঠামোর পক্ষে প্রধান যুক্তি হলো—
- টেলিভিশনের ২৪ ঘণ্টার সম্প্রচার ও শিফটভিত্তিক কর্মব্যবস্থা;
- লাইভ রিপোর্টিং ও উচ্চ পেশাগত ঝুঁকি;
- নতুন পদ ও দায়িত্বের স্বীকৃতির প্রয়োজন;
- বহুমাত্রিক প্রযুক্তিগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন।
অন্যদিকে, বিপক্ষে প্রধান যুক্তি হলো—
- বর্তমান গণমাধ্যম ক্রমেই মাল্টিমিডিয়া ও কনভার্জড নিউজরুমে পরিণত হচ্ছে;
- একই সাংবাদিক অনেক ক্ষেত্রে প্রিন্ট, অনলাইন, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে কাজ করছেন;
- পৃথক ওয়েজ বোর্ড চালু হলে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে;
- তাই সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন, রেডিও ও ভবিষ্যতের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও অভিন্ন ওয়েজ বোর্ড অধিক কার্যকর হতে পারে।
তবে উভয় পক্ষই কয়েকটি বিষয়ে একমত—সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, লিখিত নিয়োগপত্র, শ্রম অধিকার, দক্ষতাভিত্তিক পদবিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
অধ্যায় ৫
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিশ্বের অন্যান্য দেশে সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো
৫.১ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বেতন নির্ধারণে ওয়েজ বোর্ড একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। তবে অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিকদের বেতন ও চাকরির শর্ত সরকারি ওয়েজ বোর্ডের মাধ্যমে নয়; বরং শ্রম আইন, সমষ্টিগত দরকষাকষি (Collective Bargaining), নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা এবং কর্মচুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
সাধারণভাবে আন্তর্জাতিকভাবে চারটি পদ্ধতি বেশি প্রচলিত—
- সমষ্টিগত দরকষাকষি (Collective Bargaining Agreement)
- ব্যক্তিগত কর্মচুক্তি
- খাতভিত্তিক বা জাতীয় চুক্তি
- সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের পৃথক মানবসম্পদ (HR) কাঠামো
অধিকাংশ দেশে মাধ্যমভিত্তিক (প্রিন্ট, টেলিভিশন বা অনলাইন) পৃথক সরকারি ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে দায়িত্ব, দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণের প্রবণতা দেখা যায়।
৫.২ যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যে সাংবাদিকদের জন্য কোনো সরকারি ওয়েজ বোর্ড নেই। বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা সাধারণত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিক ইউনিয়নের মধ্যে সমষ্টিগত দরকষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
National Union of Journalists (NUJ) সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, ডিজিটাল ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথক চুক্তি সম্পাদন করে।
BBC-এর নিজস্ব বেতন ও মানবসম্পদ কাঠামো রয়েছে। সেখানে পদ, দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বেতন নির্ধারিত হয়। তবে এই কাঠামো বেসরকারি গণমাধ্যমের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
৫.৩ ভারত
ভারতে দীর্ঘদিন Working Journalists and Other Newspaper Employees (Conditions of Service) and Miscellaneous Provisions Act, 1955-এর অধীনে সংবাদপত্র কর্মীদের জন্য একাধিক ওয়েজ বোর্ড গঠিত হয়েছে। বচ্ছাওয়াত, মানিসানা ও মজিথিয়া ওয়েজ বোর্ড বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে এসব ওয়েজ বোর্ড মূলত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক ছিল। বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক জাতীয় ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়নি। তাদের বেতন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নীতিমালা, কর্মচুক্তি এবং শ্রম আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
৫.৪ পাকিস্তান
পাকিস্তানেও Newspaper Employees (Conditions of Service) Act, 1973-এর আওতায় সংবাদপত্র কর্মীদের জন্য ওয়েজ বোর্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মালিকপক্ষ ও সাংবাদিক সংগঠনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য সেখানে পৃথক জাতীয় ওয়েজ বোর্ড নেই; তাদের বেতন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নীতিমালা ও শ্রম আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
৫.৫ নেপাল ও শ্রীলঙ্কা
নেপালে সাংবাদিকদের ন্যূনতম পারিশ্রমিক, লিখিত নিয়োগপত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও সাংবাদিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় সাংবাদিকদের বেতন প্রধানত শ্রম আইন, কর্মচুক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। সরকারি ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাই বেশি প্রচলিত।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট—
- ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
- লিখিত নিয়োগপত্র ও চাকরির নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ শ্রম অধিকার।
- ডিজিটাল ও সম্প্রচারমাধ্যমের বিকাশের ফলে প্রচলিত বেতন কাঠামো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
৫.৬ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি
ILO, UNESCO, International Federation of Journalists (IFJ) এবং Council of Europe সাংবাদিকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বেতন হার বা ওয়েজ বোর্ডের মডেল নির্ধারণ করে না। তবে তারা কয়েকটি মৌলিক নীতির ওপর গুরুত্ব দেয়।
ILO জোর দেয় ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান এবং সমষ্টিগত দরকষাকষির অধিকারের ওপর।
UNESCO মনে করে, স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই কর্মসংস্থান অপরিহার্য।
International Federation of Journalists (IFJ) ন্যায্য বেতন, লিখিত নিয়োগপত্র, সামাজিক নিরাপত্তা, ওভারটাইম, ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সমষ্টিগত দরকষাকষির অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।
Council of Europe সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক ও পেশাগত নিরাপত্তাকে গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, অধিকাংশ দেশে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক সরকারি ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে শ্রম আইন, সমষ্টিগত দরকষাকষি এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বেতন কাঠামো কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সব দেশেই সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, লিখিত নিয়োগপত্র এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামো সংস্কারেও এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
অধ্যায় ৬
বাংলাদেশের বাস্তবতা: পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?
৬.১ বর্তমান বাস্তবতা
গত দুই দশকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে বর্তমানে একটি মাল্টিমিডিয়া বা কনভার্জড নিউজরুম ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫৯টি টেলিভিশন চ্যানেল, ১,৪৩৬টি দৈনিক পত্রিকা এবং ৪৭৪টি নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদপোর্টাল রয়েছে। অনেক গণমাধ্যম একই সঙ্গে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশ করছে।
এই পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিকদের দায়িত্বও বদলেছে। একজন প্রতিবেদক অনেক সময় একই সঙ্গে প্রতিবেদন লেখা, ভিডিও ধারণ, লাইভ সম্প্রচার, ওয়েব আপডেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন। কিন্তু বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ডে এসব নতুন দায়িত্ব ও পদের অনেকগুলোর স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
৬.২ প্রধান চ্যালেঞ্জ
টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি থাকলেও বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
- অনেক ছোট ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত।
- নবম ওয়েজ বোর্ডই এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
- বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক চুক্তিভিত্তিক বা অনানুষ্ঠানিক নিয়োগে কাজ করেন।
- একই প্রতিষ্ঠানে একজন সাংবাদিক একাধিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করায় মাধ্যমভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস জটিল হয়ে পড়ে।
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক সাংবাদিক এখনও ন্যূনতম শ্রম অধিকার থেকেও বঞ্চিত।
৬.৩ সম্ভাব্য সুফল
যদি পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড বা বিশেষ বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়, তাহলে কয়েকটি ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে—
- সম্প্রচারমাধ্যমের আধুনিক পদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি;
- দায়িত্ব ও দক্ষতাভিত্তিক বেতন-গ্রেড নির্ধারণ;
- লাইভ সম্প্রচার, নিউজ প্রোডাকশন, মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo) ও ডিজিটাল দক্ষতার মূল্যায়ন;
- টেলিভিশন সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়ন।
তবে এসব সুফল কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল।
৬.৪ সম্ভাব্য ঝুঁকি
পৃথক বেতন কাঠামো চালুর ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত প্রশ্নও সামনে আসে।
- প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিকদের মধ্যে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে।
- একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক বেতন কাঠামো পরিচালনা প্রশাসনিকভাবে জটিল হতে পারে।
- ডিজিটাল সাংবাদিক, ভিডিও টিম ও মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদকদের অবস্থান অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে।
- দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে অত্যন্ত কঠোর বা মাধ্যমভিত্তিক কাঠামো ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
৬.৫ মূল্যায়ন
বাংলাদেশের বর্তমান গণমাধ্যম বাস্তবতায় মূল প্রশ্নটি কেবল টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজ বোর্ড প্রয়োজন কি না—এটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ড কাঠামো আধুনিক মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় দেখা যায়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মাধ্যমভিত্তিক পৃথক সরকারি ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে দায়িত্ব, দক্ষতা, কর্মপরিবেশ এবং সমষ্টিগত শ্রম আলোচনার ভিত্তিতে বেতন কাঠামো নির্ধারণের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের যেকোনো সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আধুনিক, নমনীয় ও প্রযুক্তি-উপযোগী কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ও ভবিষ্যতের নতুন গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রের সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, শ্রম অধিকার এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অধ্যায় ৭
অংশীজনদের মতামত ও নীতিগত অবস্থান
৭.১ সরকার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার সাংবাদিকদের জন্য নতুন ওয়েজ বোর্ড ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম খাতের সংস্কারের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত সরকার টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক ওয়েজ বোর্ড গঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। সরকারি বক্তব্যে বরং একটি আধুনিক ও সমন্বিত বেতন কাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৭.২ সাংবাদিক সংগঠন
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (BFUJ) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (DUJ) দীর্ঘদিন ধরে নবম ওয়েজ বোর্ডের বাস্তবায়ন, দশম ওয়েজ বোর্ড গঠন, ন্যূনতম বেতন, চাকরির নিরাপত্তা এবং সাংবাদিকদের শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
২০২৫ সালে ঘোষিত ৩৯ দফা দাবিতে তারা প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন ও অন্যান্য গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ওয়েজ বোর্ড ও জাতীয় গণমাধ্যম নীতির প্রস্তাব দেয়।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (DRU) উদ্যোগে টেলিভিশন সাংবাদিকদের এক সভায় সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো, ন্যূনতম বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের দাবি উত্থাপিত হয়। ফলে সাংবাদিক সমাজের ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নধর্মী মতামত বিদ্যমান।
৭.৩ গণমাধ্যম মালিকদের সংগঠন
গণমাধ্যম মালিকদের সংগঠন—যেমন NOAB ও ATCO—এ পর্যন্ত পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে তারা সংবাদমাধ্যমের আর্থিক টেকসইতা, বিজ্ঞাপন বাজার, করনীতি এবং পরিচালনাগত ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে।
সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনায় মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের বেতন কাঠামো নির্ধারণে তাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।
৭.৪ গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক ওয়েজ বোর্ড নিয়ে একাডেমিক গবেষণা এখনও সীমিত। তবে UNESCO, UNDP এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন গবেষণা ও মূল্যায়নে সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রম অধিকার এবং গণমাধ্যম খাতের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে Broadcast Journalist Centre (BJC), BBC Media Action এবং বিভিন্ন পেশাগত আলোচনায় সম্প্রচার সাংবাদিকদের বিশেষ কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তিনির্ভর দায়িত্ব এবং অনিয়মিত কর্মঘণ্টার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
তবে পর্যালোচিত গবেষণা ও নীতিগত আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য থাকলেও, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড অধিক কার্যকর হবে, নাকি সব ধরনের গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক ও সমন্বিত ওয়েজ বোর্ড প্রণয়ন করা উচিত—এ বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
৭.৫ সারসংক্ষেপ
অংশীজনদের অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মতপার্থক্য মূলত কাঠামো নিয়ে; লক্ষ্য নিয়ে নয়। সরকার, সাংবাদিক সংগঠন, মালিকপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো—সবাই সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, শ্রম অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত। বিতর্কটি মূলত এই প্রশ্নে—এই লক্ষ্য অর্জনে পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ড অধিক উপযোগী হবে, নাকি প্রযুক্তি-উপযোগী একটি সমন্বিত জাতীয় ওয়েজ বোর্ডই হবে অধিক কার্যকর সমাধান।
অধ্যায় ৮
উপসংহার
বাংলাদেশে টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর দাবি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের সম্প্রসারণ, ২৪ ঘণ্টার সংবাদচক্র, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের বিকাশ বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ড কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। এই গবেষণায় ওয়েজ বোর্ডের ইতিহাস, আইনি ভিত্তি, টেলিভিশন সাংবাদিকতার বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অবস্থান পর্যালোচনা করা হয়েছে।
৮.১ প্রধান অনুসন্ধান
গবেষণায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
- বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ড মূলত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক; টেলিভিশন, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার অনেক নতুন পদ ও দায়িত্ব এতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
- টেলিভিশন সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন হলেও, শুধুমাত্র এই কারণেই পৃথক ওয়েজ বোর্ড প্রয়োজন—এমন কোনো বিস্তৃত নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য এখনো গড়ে ওঠেনি।
- সাংবাদিক সংগঠনগুলো ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হলেও পৃথক না সমন্বিত বেতন কাঠামো—এ বিষয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন নয়।
- আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সরকারি পৃথক ওয়েজ বোর্ডের তুলনায় শ্রম আইন, সমষ্টিগত দরকষাকষি, লিখিত কর্মচুক্তি এবং পেশাভিত্তিক বেতন কাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের বেতন, নিয়োগ এবং শ্রম অধিকার এখনও নীতিগত আলোচনায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।
৮.২ গবেষণার সীমাবদ্ধতা
এই গবেষণা মূলত বিদ্যমান আইন, সরকারি নথি, প্রকাশিত গবেষণা, সংবাদ প্রতিবেদন এবং অন্যান্য উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। টেলিভিশন সাংবাদিকদের পৃথক বেতন কাঠামো বিষয়ে বাংলাদেশে একাডেমিক গবেষণা এখনও সীমিত এবং কিছু অংশীজনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বেতন কাঠামো ও আর্থিক তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। ভবিষ্যতে নতুন তথ্য প্রকাশিত হলে এই বিশ্লেষণের কিছু অংশ হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতে পারে।
৮.৩ ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্র
ভবিষ্যতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে—
- তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের বেতন, নিয়োগ ও শ্রম অধিকার;
- টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার নতুন পদের মানসম্মত শ্রেণিবিন্যাস;
- গণমাধ্যম শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা ও ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ;
- সাংবাদিক নিবন্ধন, পেশাগত মানদণ্ড এবং শ্রম আইন ও গণমাধ্যম আইনের সমন্বয়;
- আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তি-উপযোগী বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য মডেল।
৮.৪ চূড়ান্ত মন্তব্য
এই গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিগত সমাধান নির্ধারণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিবর্তিত বাস্তবতায় টেলিভিশন সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো নিয়ে চলমান বিতর্ককে তথ্য, আইন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করা।
গবেষণার আলোকে বলা যায়, ভবিষ্যতের যেকোনো ওয়েজ বোর্ড বা বেতন কাঠামো এমন হওয়া প্রয়োজন, যা কেবল সংবাদপত্র নয়, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া এবং ভবিষ্যতের উদীয়মান গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম। একই সঙ্গে ন্যায্য পারিশ্রমিক, লিখিত নিয়োগ, চাকরির নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত যেকোনো সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে সাংবাদিকতার রূপ বদলালেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত থাকে—স্বাধীন, পেশাদার ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক অপরিহার্য। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ওয়েজ বোর্ড বা বেতন কাঠামো নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অধ্যায় ৯
FoEBD-এর মূল্যায়ন ও সুপারিশ
৯.১ FoEBD-এর মূল্যায়ন
এই গবেষণায় বাংলাদেশের ওয়েজ বোর্ডের ইতিহাস, আইনি ভিত্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান গণমাধ্যম বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বিদ্যমান ওয়েজ বোর্ড সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হলেও তা মূলত সংবাদপত্রকেন্দ্রিক। গত দুই দশকে টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার দ্রুত বিকাশের ফলে নতুন দায়িত্ব, দক্ষতা ও পদ সৃষ্টি হলেও সেগুলোর অনেকগুলোর স্পষ্ট স্বীকৃতি বর্তমান কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়নি।
গবেষণায় পৃথক টেলিভিশন ওয়েজ বোর্ডের দাবির যৌক্তিকতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি আধুনিক মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের বাস্তবতায় সম্পূর্ণ পৃথক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমানে একই সাংবাদিক অনেক ক্ষেত্রে প্রিন্ট, ভিডিও, লাইভ, ওয়েব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে কাজ করেন। ফলে শুধু মাধ্যমভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
৯.১ বর্তমান ওয়েজ বোর্ড কাঠামোর প্রধান সীমাবদ্ধতা
FoEBD-এর মূল্যায়নে বর্তমান কাঠামোর প্রধান ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে—
- নতুন পেশাগত পদের সীমিত স্বীকৃতি;
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির অভাব;
- ডিজিটাল সাংবাদিকদের অস্পষ্ট অবস্থান;
- লিখিত নিয়োগপত্র, ন্যূনতম বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বল বাস্তবায়ন;
- এবং ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা।
৯.২ FoEBD-এর নীতিগত অবস্থান
FoEBD মনে করে, বর্তমান বাস্তবতায় পৃথক পৃথক প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ওয়েজ বোর্ডের পরিবর্তে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন, নিউজ এজেন্সি এবং ডিজিটাল-ফার্স্ট নিউজরুমকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, সমন্বিত ও মাল্টিমিডিয়া ওয়েজ বোর্ড অধিক কার্যকর ও ভবিষ্যতমুখী হবে।
৯.৩ আধুনিক ওয়েজ বোর্ডে অন্তর্ভুক্তিযোগ্য নতুন পদ
আধুনিক সাংবাদিকতার পরিবর্তিত কাঠামো, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রচলিত সম্পাদকীয় পদের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিম্নোক্ত নতুন পেশাগত পদগুলোর স্বীকৃতি বিবেচনা করা যেতে পারে—
- Assignment Editor
- Output Editor
- News Producer
- Executive Producer
- Video Journalist (VJ)
- Mobile Journalist (MoJo)
- Digital Producer
- Social Media Producer
- Data Journalist
- Fact-checker
- Multimedia Journalist
- Podcast Producer
- Audience Editor
- Graphics/Visual Journalist
- AI-assisted Journalism–সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয় ও প্রযুক্তিগত দায়িত্ব
৯.৪ ওয়েজ বোর্ডের আওতায় কারা থাকবে
- সংবাদপত্র;
- টেলিভিশন;
- রেডিও;
- অনলাইন সংবাদমাধ্যম;
- ডিজিটাল-ফার্স্ট নিউজরুম;
- সংবাদ সংস্থা;
- এবং নির্ধারিত পেশাগত মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী।
৯.৫ জেলা–উপজেলা সাংবাদিকদের বিষয়ে FoEBD-এর প্রস্তাব
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বড় অংশ রাজধানীর বাইরে পরিচালিত হলেও জেলা–উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের শ্রম অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। অনেক স্থানীয় সাংবাদিক লিখিত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন, বীমা সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করেন।
এই বাস্তবতায় FoEBD প্রস্তাব করছে—
- জেলা–উপজেলা সাংবাদিকদের জন্য জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ন্যূনতম পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা;
- সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের লিখিত নিয়োগপত্র বা চুক্তি বাধ্যতামূলক করা;
- জেলা–উপজেলা প্রতিনিধি, স্ট্রিংগার ও স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম সম্মানী বা বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা;
- স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা বৃদ্ধি করা;
- ওয়েজ বোর্ডে জেলা–উপজেলা সাংবাদিকদের বাস্তব অবস্থান ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা;
- ওয়েজ বোর্ডের সুবিধা স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা;
৯.৬ সরকারের জন্য সুপারিশ
- সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য দ্রুত ১০ম ওয়েজ বোর্ড গঠন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা;
- পরিবর্তিত গণমাধ্যম বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন সংশোধন বা নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা;
- ডিজিটাল সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও নতুন ধরনের গণমাধ্যমকর্মীদের স্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি প্রদান করা;
- সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ন্যূনতম বেতন, লিখিত নিয়োগপত্র ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
- জেলা-উপজেলা সাংবাদিক, স্ট্রিংগার ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতি ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের কাঠামো তৈরি করা;
- সাংবাদিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা সুবিধা সম্প্রসারণ করা;
- ওয়েজ বোর্ডসংক্রান্ত বিরোধ ও অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা;
- গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন ও সাংবাদিক অধিকার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
- নারী সাংবাদিকসহ সকল গণমাধ্যমকর্মীর জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯.৭ গণমাধ্যম মালিকদের জন্য সুপারিশ
ক. ন্যায্য বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা ও শ্রম অধিকার
- সময়মতো ও ন্যায্য বেতন প্রদান নিশ্চিত করা;
- লিখিত নিয়োগপত্র ও চাকরির শর্তাবলি নিশ্চিত করা;
- সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব এবং অযৌক্তিক চাকরিচ্যুতি থেকে সুরক্ষা প্রদান করা;
- কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমা চালু করা;
- নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা;
- ওভারটাইম, সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা;
- ফ্রিল্যান্স, স্ট্রিংগার ও জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
- নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ তৈরি করা।
খ. অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ গণমাধ্যম কর্মপরিবেশ
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নারী সাংবাদিকসহ সকল কর্মীর জন্য সমতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে—
- নারী সাংবাদিকদের জন্য সমান কাজের সমান বেতন নিশ্চিত করা;
- নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন ও নেতৃত্বের সুযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করা;
- মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মস্থল সহায়তা ও পরিবারবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা;
- কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা;
- রাতের শিফট, মাঠ প্রতিবেদন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনে নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
- নারী সাংবাদিকদের নিরাপদ যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সহায়তা প্রদান করা;
- গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বস্থানীয় পদে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা;
- প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও পেশাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা;
- অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল সহিংসতা, হুমকি ও মানহানিকর আক্রমণ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা;
- নারী, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
৯.৮ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর জন্য সুপারিশ
- সাংবাদিকদের বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার বিষয়ে অভিন্ন নীতিগত অবস্থান গড়ে তোলা;
- গণমাধ্যম মালিকদের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দরকষাকষি জোরদার করা;
- সাংবাদিকদের জন্য ন্যায্য বেতন কাঠামো, নিয়োগপত্র ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা;
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
- নারী সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ডিজিটাল সাংবাদিক ও অন্যান্য প্রান্তিক গণমাধ্যমকর্মীদের আরও সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা;
- সদস্যদের জন্য শ্রম অধিকার, আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা;
- সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও অন্যায় চাকরিচ্যুতির ঘটনায় দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা;
- সাংবাদিকদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও পেশাগত মান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা।
৯.৯ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য রোডম্যাপ (২০২৭–২০৩০)
আধুনিক ও সমন্বিত ওয়েজ বোর্ড কাঠামো কার্যকর করার জন্য ধাপে ধাপে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। FoEBD নিম্নোক্ত রোডম্যাপ প্রস্তাব করছে—
স্বল্পমেয়াদি (২০২৭)
- ১০ম ওয়েজ বোর্ড গঠন;
- সরকার, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সংগঠন, সাংবাদিক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে জাতীয় সংলাপ আয়োজন;
- আধুনিক সাংবাদিকতার নতুন পেশাগত পদগুলোর তালিকা ও সংজ্ঞা চূড়ান্ত করা;
- ওয়েজ বোর্ডের আওতাভুক্ত গণমাধ্যম ও কর্মীদের পরিধি নির্ধারণ করা।
মধ্যমেয়াদি (২০২৮–২০২৯)
- সমন্বিত ও আধুনিক বেতন কাঠামো প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন;
- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ;
- ডিজিটাল সাংবাদিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও নতুন ধরনের গণমাধ্যমকর্মীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা;
- শ্রম অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশসংক্রান্ত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
দীর্ঘমেয়াদি (২০৩০)
- ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের কার্যকারিতা মূল্যায়ন;
- প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও সাংবাদিকতার নতুন প্রবণতার আলোকে কাঠামো নিয়মিত হালনাগাদ করা;
- নিয়মিত পর্যালোচনা, গবেষণা ও সংশোধনের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৯.১০ FoEBD-এর চূড়ান্ত অবস্থান
এই গবেষণার আলোকে FoEBD মনে করে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম বর্তমানে এমন এক পরিবর্তনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার মধ্যকার প্রচলিত বিভাজন ক্রমশ কমে আসছে। ফলে কেবল মাধ্যমভিত্তিক পৃথক বেতন কাঠামোর পরিবর্তে সব ধরনের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তি-সক্ষম মাল্টিমিডিয়া ওয়েজ বোর্ড অধিক বাস্তবসম্মত, কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।
তবে এই কাঠামো কার্যকর করতে হলে নতুন পেশাগত পদের স্বীকৃতি, ন্যায্য বেতন কাঠামো, লিখিত নিয়োগপত্র, সামাজিক নিরাপত্তা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং রাজধানীর বাইরে কর্মরত জেলা–উপজেলা সাংবাদিকদের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
FoEBD বিশ্বাস করে, সাংবাদিকদের ন্যায্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা শুধু একটি পেশাগত দাবি নয়; এটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ওয়েজ বোর্ড সেই লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
মরিয়ম শেলী
প্রধান গবেষক
ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন বাংলাদেশ (FoEBD)
তথ্যসূত্র
উদ্ধৃতি শৈলী (Citation Style): APA (৭ম সংস্করণ)
আইন ও সরকারি গেজেট
বাংলাদেশ সরকার। (১৯৭৪)। দ্য নিউজপেপার এমপ্লয়িজ (কন্ডিশনস অব সার্ভিস) আইন, ১৯৭৪ (আইন নং ৩০, ১৯৭৪)। ঢাকা: বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়।
বাংলাদেশ সরকার। (২০০৬)। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (আইন নং ৪২, ২০০৬)। ঢাকা: বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়।
বাংলাদেশ সরকার। (২০১৯)। সংবাদপত্র কর্মচারীদের নবম ওয়েজ বোর্ড সম্পর্কিত গেজেট প্রজ্ঞাপন। তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়। (২০২৬)। নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং প্রস্তাবিত দশম ওয়েজ বোর্ড বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সংসদীয় প্রশ্নোত্তর ও কার্যবিবরণী। ঢাকা: জাতীয় সংসদ সচিবালয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নীতিমালা
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)। (১৯৪৯)। সংগঠন করার অধিকার ও সমষ্টিগত দরকষাকাশি কনভেনশন, ১৯৪৯ (কনভেনশন নং ৯৮)। জেনেভা: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)। (২০২২)। কর্মক্ষেত্রে মৌলিক নীতি ও অধিকার বিষয়ক আইএলও ঘোষণা। জেনেভা: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (IFJ)। (বিভিন্ন বছর)। সাংবাদিকদের অধিকার ও নীতিমালা বিষয়ক দলিল। ব্রাসেলস: International Federation of Journalists।
ইউনেস্কো (UNESCO)। (২০২১)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা বিষয়ক ইউনেস্কো সুপারিশ। প্যারিস: UNESCO।
ইউনেস্কো (UNESCO) ও ইউএনডিপি (UNDP)। (২০২৫)। বাংলাদেশ মিডিয়া নিডস অ্যাসেসমেন্ট। ঢাকা।
ইউরোপ কাউন্সিল (Council of Europe)। (বিভিন্ন বছর)। সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সুপারিশমালা। স্ট্রাসবুর্গ।
সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাগত নথি
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (BFUJ)। (২০২৫)। ৩৯ দফা দাবি। ঢাকা।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (DUJ)। (২০২৫–২০২৬)। ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিবৃতি ও নীতিপত্র। ঢাকা।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (DRU)। (২০২৬)। টেলিভিশন অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর ও চিফ রিপোর্টারদের মতবিনিময় সভার কার্যবিবরণী। ঢাকা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক কাঠামো
National Union of Journalists (NUJ)। (বিভিন্ন বছর)। Collective bargaining agreements and employment guidelines। লন্ডন।
British Broadcasting Corporation (BBC)। (বিভিন্ন বছর)। Employment and salary structure guidelines। লন্ডন।
ভারত সরকার। (১৯৫৫)। Working Journalists and Other Newspaper Employees (Conditions of Service) and Miscellaneous Provisions Act, 1955।
পাকিস্তান সরকার। (১৯৭৩)। Newspaper Employees (Conditions of Service) Act, 1973।
অনলাইন উৎস
- বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়
- বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়
- আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)
- ইউনেস্কো (UNESCO)
- আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (IFJ)
- ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (NUJ), যুক্তরাজ্য
- ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (BBC)
পরিশিষ্ট
পরিশিষ্ট–১: বাংলাদেশে সাংবাদিক ওয়েজ বোর্ডের সময়রেখা (১ম–৯ম ওয়েজ বোর্ড)
গঠনের বছর | চেয়ারম্যান | আইনি ভিত্তি | গেজেট | প্রধান সুপারিশ | বাস্তবায়নের অবস্থা
পরিশিষ্ট–২: নবম ওয়েজ বোর্ডের পদভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস
(সরকারি গেজেট অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পদতালিকা সংযুক্ত করা হবে)
পরিশিষ্ট–৩: বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর প্রাসঙ্গিক ধারা
ধারা ১৪৩
সংরক্ষণ (Saving) বিধান
প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা
পরিশিষ্ট–৪: ১৯৭৪ সালের সংবাদপত্র কর্মচারী (চাকরির শর্ত) আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা
ধারা ৯
ধারা ১১
ওয়েজ বোর্ড-সংক্রান্ত বিধান
পরিশিষ্ট–৫: ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর প্রদত্ত তথ্য
- টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা
- সম্প্রচাররত টেলিভিশনের সংখ্যা
- দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা
- নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা
- নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নসংক্রান্ত মামলার তথ্য
- দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনে সরকারের অবস্থান
পরিশিষ্ট–৬: আন্তর্জাতিক তুলনামূলক কাঠামো
| দেশ | সরকারি ওয়েজ বোর্ড | সমষ্টিগত দরকষাকাশি (CBA) | টেলিভিশনের পৃথক কাঠামো |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ✓ | সীমিত | না |
| যুক্তরাজ্য | ✗ | ✓ | না |
| ভারত | আংশিক | ✓ | না |
| পাকিস্তান | আংশিক | সীমিত | না |
| নেপাল | সীমিত | ✓ | না |
| শ্রীলঙ্কা | ✗ | ✓ | না |
পরিশিষ্ট–৭: FoEBD প্রস্তাবিত আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ওয়েজ বোর্ডে অন্তর্ভুক্তিযোগ্য নতুন পদসমূহ
- অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর (Assignment Editor)
- আউটপুট এডিটর (Output Editor)
- নিউজ প্রডিউসার (News Producer)
- এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার (Executive Producer)
- ভিডিও সাংবাদিক (Video Journalist – VJ)
- মোবাইল সাংবাদিক (Mobile Journalist – MoJo)
- ডিজিটাল প্রডিউসার (Digital Producer)
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রডিউসার (Social Media Producer)
- ডেটা সাংবাদিক (Data Journalist)
- তথ্য যাচাইকারী (Fact-checker)
- মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক (Multimedia Journalist)
- অডিয়েন্স এডিটর (Audience Editor)
- পডকাস্ট প্রডিউসার (Podcast Producer)
- গ্রাফিক্স/ভিজ্যুয়াল সাংবাদিক (Graphics/Visual Journalist)
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক সাংবাদিকতা (AI-assisted Journalism) সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব





