আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch–HRW) বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্টের অভিযোগে অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক চর্চারই ধারাবাহিকতা এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন বন্ধ এবং অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে—এমন বিধান সংশোধন বা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়।
কার্টুন পোস্টের অভিযোগে গ্রেপ্তার
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এ এম হাসান নাসিম। তাকে ১৭ এপ্রিল ঢাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন সরকারি দলের সংসদ সদস্যকে নিয়ে একটি কার্টুন প্রকাশ করেন এবং সংসদে দেওয়া ওই সংসদ সদস্যের একটি রসাত্মক মন্তব্য উদ্ধৃত করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাসীন দলের এক সমর্থকের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশের বিধান অনুসরণ হয়নি: HRW
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ অনলাইন কনটেন্টের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার প্রতিনিধিকেই অভিযোগ দায়েরের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে আইনের অপব্যবহার কমানো যায়।
তবে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোতে এই বিধান অনুসরণ করা হয়নি বলে সংস্থাটি দাবি করেছে। তাদের মতে, যেসব ব্যক্তি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নন, তারাই অভিযোগ দায়ের করেছেন, যা অধ্যাদেশের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক অধিকার
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) অনুচ্ছেদ ১৯-এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধানেও বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত।
পূর্ববর্তী সরকারের দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ
বিবৃতিতে সংস্থাটি উল্লেখ করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় সাংবাদিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এবং সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্যপ্রবাহে বাধা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া আন্দোলন দমনে কারফিউ এবং কথিত ‘দেখামাত্র গুলির’ নির্দেশ জারির অভিযোগ তুলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, এতে শত শত মানুষের মৃত্যু ও হাজারো মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
সরকারের প্রতি HRW-এর আহ্বান
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাই নতুন সরকারের উচিত প্রকৃত সংস্কারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করা।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের অভিযোগে ব্যবহারকারীদের গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং ভিন্নমত দমনে আইনের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তথ্যসূত্র:
১. Human Rights Watch — 23 April 2026 “Bangladesh: 4 Arrested for ‘Insulting’ Government”
২. The Daily Star — 18 April 2026 “Man shown arrested in cyber case after DB detention”, 19 April 2026
“Man sent to jail over post on chief whip” এবং 21 April 2026 “Content creator Hasan Nasim granted bail in cyber security case”





